আমার বাবা একজন কৃষক, দিনমজুর, আইস্ক্রিম বিক্রেতা, হাতে ছাপ তথা রং দেওয়াওআলা আবার কখনো কবিরাজ। অনেকে বলতে পারেন এতকিছু কিভাবে সম্ভব? হ্যাঁ ভাই সম্ভব। যখন চারটি ছেলে সন্তান একটি কন্যা সন্তান ঘরে থাকে এবং রোজকারের কোন পথ না থাকে এবং বাড়ির ভিটেতেও এক শতাংশ জমি না থাকে তখন এসব পেশায় সম্ভব। তার শখ ছিলো আমাকে বিসিএস ক্যাডার বানাবেন। এবং তিনি এ ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। তাই সিদ্ধান্ত হলো ক্লাস ফাইভ এ বৃত্তি পরীক্ষা দিতে হবে। আমি অবশ্য উপ-আনুষ্ঠানিক ব্র্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আমার অক্ষর জ্ঞান অর্জন করেছি ব্র্যাক স্কুল থেকেই। মাঝে মাঝে আমার বাবা পরের জমিতে কাজ করত, আমি ভাত নিয়ে যেতাম। আবার কখনো কখনো বর্গা চাষ করতেন। আমি বাবার সাথে মাঠে যেতাম কাজ করতাম। বাবার স্বপ্ন যেটা সেই স্বপ্নের আলোকেই আমিও ব্যাপারটা মেনে নিয়েই সেরকম প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তির জন্য মনোনীত হয়েছিলাম বৃত্তি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম কিন্তু বৃত্তি পায়নি, এভাবেই পঞ্চম শ্রেণী শেষ করি কিন্তু এরপর আর পড়ালেখা কন্টিনিউ করতে পারিনি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে শরুশুনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সেভাবে ক্লাস করা হয়নি মাত্র প্রথম এক মাস ক্লাস করেছি। এরপর সোনালী টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার এর আওতায় দর্জিবিজ্ঞান প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি এবং বাজারে একটি দোকান নিয়ে কাপড় উঠিয়ে ওই বয়সেই নিজেই দর্জি হয়ে যায়। যখন আমি দর্জি তখন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা যখন আমার কাছে কাপড় তৈরি করতে আসতো তখন ওদেরকে দেখে আমার খুব আফসোস হতো ইশ আমি যদি ওদের মত স্কুলে যেতে পারতাম।
তখন আমার মামা বাড়ি থেকে আমার বড় মামা নেয়ামত কাতলী গ্রাম থেকে আসলো এবং আমাকে নিয়ে গেল কাকলি মাধ্যমিক বিদ্যালয় অষ্টম শ্রেণীতে রোল নাম্বার ৭৭ এ ভর্তি হলাম, ইতিমধ্যে ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণী চলে গেছে কিন্তু আমি এই দুই শ্রেণীতে পড়তে পারলাম না অর্থাৎ আমার জীবনে ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণি পড়া হয়নি, কিছুদিন পরেই অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার জন্য মনোনীত হলাম আমার মামা ওরফে বন্ধু আনিসুর রহমান খোকন এবং বান্ধবী জিনিয়া, শাবানা, রিনা, জসিম, সিবাদুল, কামরুল, ইমরানসহ আমার ক্লাসের সবাই সর্বদা আমাকে প্রেরণাদিত ভালোবাসতো। নবম শ্রেণীতে রোল নাম্বার হল তিন হলো, রেজাল্টের দুই তিন দিন পরেই আমার মামাদের ঘর বাড়ির সব পুড়ে গেল সাথে আমার বইপত্রসহ সেলাই মেশিনটাও পুড়ে গেল। কাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাকে টাকা দিল আমি বই ক্রয় করে আবার পড়া শুরু করলাম, দশম শ্রেণীতে রোল হলো দুই এভাবে আমার লেখাপড়ার গতি বৃদ্ধি পেল এবং আমাকে সবসময়ই কাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রেরণা দিত আমার খুব ভালো লাগতো। এভাবেই এসএসসি পাস। মামা বাড়ি থাকতাম দর্জি কাজ কার করতাম আর পড়ার খরচ চালাতাম
আমি জানতামও না, কেনো পড়ছি। লোকজন আমাকে আদর করতো, উৎসাহ দিতো এজন্যই পড়তাম। কিন্তু আমি জানতাম না আমি কতদূর পর্যন্ত পড়তে পারব। এভাবেই অনেক কষ্টে এসএসসি শেষ করলাম।
এরপর ভর্তি হলাম বাঘারপাড়া ডিগ্রী কলেজে। শুরুতে বুদ্ধি এবং পরামর্শ সবকিছু দিয়েছে কাঠালবাড়িয়া গ্রামের অলিয়ার রহমান ট্রিটো যাকে দুলাভাই বলতাম। এরপর বাঘারপাড়ায় গেলে বইপত্র দিয়ে হেল্প করা থেকে শুরু করে আমাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছে আমার বন্ধু জহুরুল ইসলাম। সে আজ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। আমাকে আরো সহযোগিতা করেছে আমার গ্রামের বন্ধু আলমগীর হোসেন, সে আজ বোনাগাঁতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমাকে আরো সহযোগিতা করেছে আবার বন্ধু রবিউল ইসলাম সে আজ রেনেটা ফার্মাসিটিক্যাল জব করে।
কলেজে থাকাকালীন সময় থেকেই বিসিএস প্রিপারেশন নিতে শুরু করলাম। বাবাকে বিষয়টা জানালে বাবা এমনভাবে প্রচার করলেন, সবাই ভাবলো আমি বিসিএস ক্যাডার হয়ে গেছি। তারপর এডমিশনের সময়ে ভর্তি হলাম ফার্মগেটে শুভেচ্ছা কোচিংএ। কোচিংয়ে মোটামোটি রেজাল্ট আসলেও কখনোই নিরাশ হতাম না। আমি স্থির করে নিয়েছিলাম যে বিশেবিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে। তার জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করেছিলাম। তারপরও বিশেবিদ্যালোয়ে চান্স পেলাম না । সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হলাম যশোর সরকারী এম এম কলেজে। এখানেই অনার্স সহ মাস্টার্স শেষ করলাম ২০১১ ব্যাচে। এখানেও আমাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে হেল্প করেছিল কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী তার ভেতরে আলাউদ্দিন আল আজাদ স্যার, জাকির আল ফারুকী স্যার এবং আমার বন্ধু জাহিদ ওরফে মুকুল, হেলাল, দেবুশ্রী, তালাত মাহমুদসহ অনেকেই।
আমার আত্মীয়-স্বজন মা-বাবা ভাই-বোন সবাই চাইতো আমি যেন বিসিএস ক্যাডার হই। কিন্তু আমি তা হতে পারেনি। তাই বলে আমি থেমে থাকেনি। মাগুরাই ফিউচার কিডস স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর শত্রু জিতপুর বিদ্যাকুস স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। ইতিমধ্যে বিয়ে করি আমার দুটি কন্যা সন্তানও আছে। এরপর আমি ব্র্যাক এনজিওর চাকরিতে ঢুকি 2017 সালে। খুবই সফলতার সাথে কাজ করি এবং হেড অফিসে অফিসার পদে মাইক্রো ফাইনান্স এ প্রমোশন হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। সেখানে 2021 সালের মার্চের ৮ তারিখ পর্যন্ত চাকরি করি। পারিবারিক বিশাল এক সমস্যার কারণে আমি চাকরি ছেড়ে দিই। আগে থেকেই পল্লী চিকিৎসকের কোর্স করা ছিল এ প্লাস রেজাল্ট ছিল, ফার্মাসিস্ট কোর্স করে, ড্রাগ লাইসেন্স করি এবং উত্তর শরুশুনা মিনা বাজারে ইত্যাদি ফার্মেসি স্থাপন করি। প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল হওয়াতে আমি এখানেও খুব বেশি একটা সফল হতে পারছি না। ছোট্ট একটি বাজার সকালেও যারা আমার কাস্টমার বিকেলেও তারাই কাস্টমার তাই এখান থেকে আমার সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এমত অবস্থায় প্রতিদিন বিডি জবসে চাকরির ওয়েবসাইট ভিজিট করেই সময় পার করছি। এখন আমার বয়স ৩৩ বছর ১০ মাস প্লাস। আমি জানিনা আমি কোন দিকে যাচ্ছি, আমি জানিনা আমার গন্তব্য কি। দেশের স্বনামধন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, বিশেষ করে অনেক বড় বড় এনজিও প্রতিষ্ঠান আছে। যদি তাদের কেও আমার পাশে দাঁড়াই আমি চির কৃতজ্ঞ হব।
আমার সৃষ্টিকর্তা এবং বাবা মায়ের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা আমাকে আজকের দিন অব্দি নিয়ে আসার জন্য। তাদের ভালোবাসা নিয়েই বাকিপথ পাড়ি দিতে চাই।
দারিদ্রতা কখনো আমার পড়ালেখায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আমার বাবাকে আমি বলতে চাই,
"আব্বা, আমি হয়তো বিসিএস ক্যাডার হতে পারেনি, কিন্তু একজন প্রকৃত মানুষ হয়েছি।
মো: কামাল হোসেন
ইত্যাদি ফার্মেসী, শুরুশুনা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন